মৌমিতা খাতুন নামটা হয়তো অনেকেরই অজানা। অথচ আলিপুরদুয়ারের এক চা বাগান থেকে উঠে এসে জেলা ও রাজ্য স্তরে প্রায় ২৫টি পদক জিতে নিয়েছেন তিনি। বক্সিং, জুডো ও কারাতে তিনটি খেলাতেই তাঁর সাফল্যের ছাপ স্পষ্ট। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এমন প্রতিভার গল্প খুব কমই শিরোনামে জায়গা পায়।

আলিপুরদুয়ার জেলার মাদারিহাট ব্লকের হান্টাপাড়া টি গার্ডেন চা পাতার সুবাসে ভরা এক ছোট্ট গ্রাম। সেখানেই জন্ম ও বড় হয়ে ওঠা মৌমিতার। খুব অল্প বয়সেই বাবাকে হারান। সংসারের একমাত্র ভরসা মা, যিনি দিনরাত চা বাগানে পরিশ্রম করে কোনোরকমে সংসার চালাতেন। অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী।

তবুও ছোটবেলা থেকেই মৌমিতার চোখে ছিল বক্সিংয়ের স্বপ্ন। গ্রাম থেকে দুই-তিন ঘণ্টার বাসযাত্রা পেরিয়ে ক্লাবে পৌঁছাতেন। অনেক দিন ভাড়ার টাকাও থাকত না। তবুও রিংয়ে ঘাম ঝরানো বন্ধ করেননি। কারণ তিনি জানতেন—লড়াই করাটাই তাঁর আসল শক্তি। অভাব শুধু সংসারের নয়, খেলাধুলার ক্ষেত্রেও বারবার টেনে ধরেছে মৌমিতাকে।

বহু প্রতিযোগিতায় সুযোগ পেয়েও শুধুমাত্র অর্থের অভাবে যেতে পারেননি। ক্লাবে নিয়মিত অনুশীলন করাটাও ছিল একপ্রকার যুদ্ধ। মৌমিতা বলেন,“অনেকেই সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, কিন্তু বাস্তবে পাশে দাঁড়ায়নি কেউ।

তখন ভেবেছি, নিজের লড়াইটা আমাকে একাই লড়তে হবে।”সেই জেদ থেকেই একসময় তিনি নিজেই চা ফ্যাক্টরিতে কাজ শুরু করেন। শ্রমের টাকায় কিনেছেন গ্লাভস, জোগাড় করেছেন যাতায়াত খরচ।

একদিকে রিংয়ের লড়াই, অন্যদিকে জীবনের লড়াই—দুটোই একসঙ্গে সামলেছেন তিনি। সংগ্রামের পথ থামাতে পারেনি তাঁকে। একের পর এক অর্জন এসেছে, ২০১৭ সালে প্রথম জেলা জুডো প্রতিযোগিতায় গোল্ড, ২০১৮ সালে বেঙ্গল অলিম্পিকে সিলভার,একই বছর জেলা বক্সিংয়ে গোল্ড, ২০১৯ সালে টেস্ট বক্সিংয়ে গোল্ড, ২০২০ সালে জেলা গেমসে গোল্ড , ২০২২ সালে নর্থ বেঙ্গল চ্যাম্পিয়নশিপে গোল্ড ও টেস্টে সিলভার ২০২৫ সালে আবার জেলা স্তরে গোল্ড ও রাজ্য স্তরে সিলভার সব মিলিয়ে প্রায় ২৫টি পদক। যার প্রতিটিকে তিনি বলেন,“এগুলো ধাতুর টুকরো নয়, আমার মায়ের ঘাম আর আমার লড়াইয়ের প্রমাণ।”

ন্যাশনাল স্তরে খেলার সুযোগ এসেছিল। কিন্তু ব্যক্তিগত কারণে যাওয়া হয়নি। আবার ২০২৫ সালে সিনিয়র উইমেন্স চ্যাম্পিয়নশিপ বাতিল হওয়ায় আরেকটি স্বপ্ন অপূর্ণ থেকে যায়। ধীরে ধীরে যেন থমকে যায় তাঁর খেলাধুলার জীবন। আজ মৌমিতা আর রিংয়ে নামেন না। তিনি এখন একজন গৃহবধূ। জীবনের নতুন অধ্যায়ে পা রেখেছেন। তবে লড়াইয়ের মানসিকতা বদলায়নি।

বর্তমানে তিনি সোশ্যাল মিডিয়ায় একজন কন্টেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবে নিজেকে তুলে ধরছেন। খেলাধুলার বাইরের এক নতুন জগতে নিজের পরিচয় গড়তে মরিয়া তিনি। আমাদের প্রতিনিধির সঙ্গে কথোপকথনে মৌমিতা জানান, জীবনে অনেক কষ্ট দেখেছেন, অনেক অভাব-অভিযোগ সহ্য করেছেন।

এখনো কোনো সরকারি চাকরি জোটেনি। তবুও তিনি আশা ছাড়েননি। “আজ না হোক কাল, যদি কপালে লেখা থাকে, অবশ্যই একটা চাকরি পাবো।”মৌমিতার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রেরণা তাঁর মা।

ক্লান্ত শরীরে কাজ সেরে বাড়ি ফিরেও মেয়ের গ্লাভস পরিষ্কার করেছেন, সাহস জুগিয়েছেন। আজ তাঁর জীবনসঙ্গীও সমানভাবে পাশে আছেন। নতুন পথচলায় অনুপ্রেরণা দিচ্ছেন প্রতিনিয়ত। হয়তো আর দেখা যাবে না তাঁকে বক্সিং রিংয়ে। কিন্তু তাই বলে কি তাঁর গল্প শেষ? না। এটা হার নয়, এটা রূপান্তর।

চা বাগানের মাটিতে জন্ম নেওয়া এক লড়াকু মেয়ের গল্প—যিনি প্রমাণ করেছেন, অভাব বাধা নয়; ইচ্ছাশক্তিই আসল শক্তি। সমাজের সেইসব মানুষদের জন্য তিনি এক জোরালো জবাব, যারা মনে করেন মেয়েরা পারে না। আজ তিনি গৃহবধূ, কন্টেন্ট ক্রিয়েটর। কিন্তু তাঁর ভেতরের যোদ্ধা এখনো বেঁচে আছে।কারণ, মৌমিতা খাতুন জানেন লড়াই থামলে তবেই হার, আর তিনি এখনো লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।