বাবলু রহমান, জলপাইগুড়ি: ডুয়ার্স জুড়ে প্রবল ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর সামনে এসেছে। জলপাইগুড়ি জেলার বানারহাট ও ধুপগুড়ি ব্লকের একাধিক এলাকায় এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে ডুয়ার্সের দুরামারি এলাকায় সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

প্রকৃতির তাণ্ডবে কার্যত লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে এই অঞ্চল। স্থানীয়দের বক্তব্য অনুযায়ী, সন্ধ্যা প্রায় সাড়ে ছটা নাগাদ হঠাৎ করেই আকাশ কালো মেঘে ঢেকে যায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হয় প্রবল ঝড়ের সঙ্গে শিলাবৃষ্টি। টানা প্রায় রাত নটা পর্যন্ত চলে এই ঝড়-বৃষ্টি। ঝড়ো হাওয়ার তীব্রতা এতটাই ছিল যে বহু কাঁচা ও টিনের ঘরের চাল উড়ে যায় এবং অনেক বাড়ি আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

প্রবল ঝড়ে বিভিন্ন এলাকায় বড় বড় গাছ উপড়ে পড়ে রাস্তায়, ফলে বহু গ্রামীণ সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয়। কোথাও কোথাও রাস্তা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। স্থানীয় বাসিন্দারা নিজেরাই উদ্যোগ নিয়ে গাছ সরিয়ে রাস্তা পরিষ্কার করার কাজ শুরু করেছেন। এছাড়াও ঝড়ের তাণ্ডবে বিদ্যুতের খুঁটি ও তার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় একাধিক এলাকায় বিদ্যুৎ পরিষেবা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এই দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন এলাকার কৃষকেরা।

শিলাবৃষ্টি ও টানা বৃষ্টির ফলে বিঘার পর বিঘা কৃষিজমির ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। আলু, শিম, মটরশুঁটির মতো শীতকালীন সবজির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে বলে জানা গেছে। এতে করে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন স্থানীয় কৃষকরা।

শুধু ফসল নয়, বহু পরিবারের ঘরবাড়িও ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোথাও বাড়ির ওপর বড় গাছ ভেঙে পড়েছে, কোথাও আবার ঝড়ের দাপটে টিনের চাল উড়ে গিয়ে পড়েছে অন্যত্র।

দুরামারি ও আশপাশের এলাকায় একাধিক পরিবার অল্পের জন্য বড় দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পেয়েছেন।এলাকার তৃণমূল নেতা জিয়ারুল হক জানান, সকাল থেকেই তিনি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে রয়েছেন। তিনি বলেন, “সকাল থেকেই আমি মানুষের পাশে রয়েছি এবং পরিস্থিতি খতিয়ে দেখছি।

ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির জন্য কীভাবে দ্রুত ক্ষতিপূরণ ও সাহায্যের ব্যবস্থা করা যায়, সে বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলছি। যত দ্রুত সম্ভব মানুষের থাকার ব্যবস্থা ও খাবারের ব্যবস্থা করে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।”

অন্যদিকে স্থানীয় বাসিন্দা রবি রায় জানান, ঝড়ে তার ঘরের টিনের চাল সম্পূর্ণ উড়ে গেছে। তিনি বলেন, “আমাদের এখন থাকার মতো কোনো ব্যবস্থা নেই।

আলুর দামে ধসের আশঙ্কা চিন্তায় কপালে ভাজ পড়েছে কৃষকদের। এখন জমি থেকে আলু তুলতেই ভয় পাচ্ছেন কৃষক।

ঘরের চাল উড়ে যাওয়ায় পরিবার নিয়ে খুব সমস্যায় পড়েছি।” আর এক বাসিন্দা দীপা রায় জানান, তিনি তার সন্তানদের নিয়ে অল্পের জন্য বড় দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পেয়েছেন। ঝড়ের সময় তার বাড়ির পাশে একটি বিশাল গাছ ভেঙে পড়ে এবং অল্পের জন্য তা তার সন্তানের ওপর পড়া থেকে রক্ষা পায়।

দীপার কথায়, “সবকিছুই প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে। স্বামী দিনমজুরের কাজ করেন, সেও বাড়িতে ছিল না। এখন কীভাবে সব সামলাব বুঝতে পারছি না।” এ বিষয়ে স্থানীয় বাসিন্দা তথা কংগ্রেস নেতা আফিজুর রহমান বলেন, “এটা সত্যিই খুব মর্মান্তিক ও দুঃখজনক একটি ঘটনা। তবে প্রকৃতির সঙ্গে তো কেউ পাল্লা দিতে পারে না।

আমরা সরকারের কাছে আবেদন করছি, তারা যেন যত দ্রুত সম্ভব ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ান। আমরাও এলাকার মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করছি।” অন্যদিকে তৃণমূলের বানারহাট ব্লকের ব্লক সভাপতি সন্দীপ ছেত্রী জানান, তারাও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে রয়েছেন। তিনি বলেন, “ইতিমধ্যেই বিডিও সাহেবের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে।

আমরা যত দ্রুত সম্ভব মানুষের সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করছি। হয়তো ১০০ শতাংশ সমাধান একসঙ্গে সম্ভব নয়, তবে অন্তত ৯০ শতাংশ সমস্যার দ্রুত সমাধান করার চেষ্টা থাকবে। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে ত্রিপল ও শুকনো খাবার পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।”

এই ঘটনায় যদিও বড় কোনো প্রাণহানির খবর এখনও পর্যন্ত পাওয়া যায়নি, তবে বহু পরিবার আতঙ্কের মধ্যে রাত কাটিয়েছেন। এখনও পর্যন্ত প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই ঘটনার বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ক্ষয়ক্ষতির পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হয়নি। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার বাসিন্দারা দ্রুত সরকারি সাহায্যের আশায় প্রহর গুনছেন।

