বাবলু রহমান : এক গুচ্ছ স্বপ্ন নিয়ে বিয়ের পিঁড়িতে বসেছিলেন দুরমারির দক্ষিণ শালবাড়ি এলাকার মেয়ে দীপা সরকার সাহা। ছোটবেলা থেকেই আদর-ভালোবাসায় বড় হওয়া এক চঞ্চল, হাসিখুশি মেয়ে। পরিবারে সবার ছোট হওয়ায় আবদারের শেষ ছিল না। বাবা, মা, ভাই, বোন থেকে শুরু করে পাড়ার মানুষ সকলের কাছেই সে ছিল নয়নের মণি। কিন্তু যে মেয়েটা একদিন সুখের সংসারের স্বপ্ন দেখেছিল, আজ সেই মেয়েই চোখের জলে দিন কাটাচ্ছেন নিজের ছোট্ট কন্যা সন্তানকে আঁকড়ে ধরে।

২০২২ সালের ২০ নভেম্বর শুরু হয় দীপার দাম্পত্য জীবন। প্রথমদিকে সবকিছু ঠিকঠাকই চলছিল। নতুন সংসার, নতুন মানুষ, নতুন স্বপ্ন সবকিছু নিয়েই নিজের মতো করে সুখ খুঁজছিলেন তিনি। কিন্তু বিয়ের এক বছরের মধ্যেই বদলে যেতে থাকে পরিস্থিতি। ধীরে ধীরে তার জীবনে নেমে আসে অন্ধকার। অভিযোগ, স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজনের অত্যাচার ক্রমশ বাড়তে থাকে। কখনও টাকার জন্য চাপ, কখনও শারীরিক নির্যাতন, আবার কখনও মানসিক অত্যাচার। ছোটবেলায় অন্যদের মুখে যে পণপ্রথার গল্প শুনতেন, সেই একই দুঃসহ বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে, তা কখনও ভাবেননি দীপা।

দীপা জানান, বিয়ের পর স্বামী যা চাইতেন, সবই দেওয়ার চেষ্টা করতেন তিনি। টাকা থেকে শুরু করে বিয়েতে পাওয়া গয়নাগাটি সবই তুলে দিয়েছিলেন স্বামীর হাতে। অভিযোগ, সেই গয়নাও নষ্ট হয়ে যায় বিভিন্নভাবে। কিন্তু তাতেও শেষ হয়নি অত্যাচার। টাকার চাহিদা পূরণ না হলেই শুরু হতো অশান্তি, মারধর, অপমান। দিনের পর দিন অত্যাচারের মাত্রা এতটাই বেড়ে যায় যে একসময় জীবন শেষ করে দেওয়ার কথাও ভেবেছিলেন দীপা। কিন্তু নিজের ছোট্ট কন্যা সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে শেষ পর্যন্ত নিজেকে সামলে নেন। আজ সেই সন্তানই তার বেঁচে থাকার একমাত্র কারণ।

অভিযোগ অনুযায়ী, স্বামী একটি রেশন ডিলারের অধীনে কাজ করতেন। কিন্তু সংসারের দায়িত্ব নেওয়ার বদলে নিজের উপার্জনের বেশিরভাগটাই নেশার পেছনে খরচ করতেন। ফলে সংসারের খরচ চালানোর জন্য বিভিন্ন কাজ করতে হতো দীপাকে। এখানেই শেষ নয়, দীপার দাবি, একসময় তার স্বামী তাকে অশালীন কাজ করারও ইঙ্গিত দেন, যাতে সেখান থেকে টাকা এনে সংসার চালানো যায়। সেই প্রস্তাবে রাজি না হওয়াতেই অত্যাচারের মাত্রা আরও বেড়ে যায় বলে অভিযোগ।

দিনের পর দিন দীপা ও তার ছোট্ট শিশুকে অন্ধকারে দিন কাটাতে হতো বলেও অভিযোগ। যতক্ষণ না দীপা বৈদ্যুতিক বিল মেটাতেন, ততক্ষণ বাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগ থাকত না। পাশাপাশি বাপের বাড়ি থেকেও টাকা আনার জন্য নিয়মিত চাপ দেওয়া হতো বলে দাবি তার। সেই চাপে পড়ে বহুবার আত্মীয়-স্বজনদের কাছ থেকে ধার করে স্বামীকে টাকা দিয়েছেন দীপা।

অভিযোগ, বিয়ের ছয় মাসের মধ্যেই তিন লক্ষ টাকা আনার জন্য চাপ দেন তার স্বামী। বাধ্য হয়ে পিসতুতো ভাইয়ের কাছ থেকে ধার নিয়ে সেই টাকা দেন তিনি। কিন্তু আজও সেই ঋণ শোধ করতে পারেননি দীপা। এমনকি মাইক্রো ফাইন্যান্স সংস্থা থেকেও ঋণ তুলে স্বামীকে টাকা দিতে হয়েছে বলে দাবি তার। সেই ঋণের বোঝাও এখনও বয়ে বেড়াচ্ছেন তিনি।

অভিযোগ আরও, প্রায়ই মদ্যপ অবস্থায় বাড়ি ফিরে মাঝরাতে দীপাকে ঘর থেকে বের করে দিতেন তার স্বামী। তখন ছোট্ট শিশুকে নিয়ে সারা রাত রাস্তায় কাটাতে হতো তাকে। কখনও সন্ধ্যাবেলায় বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হতো, তারপর রাত ১১টা বা ১২টার সময় আবার ঘরে ফিরতে পারতেন দীপা।

এইভাবেই চলত মানসিক ও শারীরিক অত্যাচার। দীপার অভিযোগ, মদ খেয়ে এসে শিশুর গায়ের উপর ধুলো-মাটি ও নোংরা কাপড় নিয়েই শুয়ে পড়তেন তার স্বামী। প্রতিবাদ করলেই জুটত মারধর।

শুধু স্বামী নন, শ্বশুরবাড়ির অন্যান্য সদস্যদের বিরুদ্ধেও নির্যাতনের অভিযোগ তুলেছেন তিনি। কখনও শ্বশুর-শাশুড়ি, কখনও পরিবারের অন্য সদস্যদের কাছ থেকেও অপমান ও অত্যাচারের শিকার হতে হয়েছে বলে দাবি। এমনকি বাড়ির জিনিসপত্র ভাঙচুর করা হয়, বিয়েতে পাওয়া বহু উপহারও নষ্ট করে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ।

দীপার কথায়, বিশ্বাসের পর বিশ্বাস ভেঙেছে। যাদের আপন ভেবেছিলাম, তারাই কষ্ট দিয়েছে। কিন্তু এখন আর ভেঙে পড়লে চলবে না। আমার মেয়ের জন্য আমাকে বাঁচতে হবে।

অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে অবশেষে শ্বশুরবাড়ি ছাড়তে বাধ্য হন তিনি। যদিও সরাসরি বাবার বাড়িতে ফিরে আসেননি। কিছুদিন বিভিন্ন আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে কাটাতে হয়। অন্যদিকে বিয়ের ছ’মাসের মধ্যেই দীপার মা মারা যান। সেই শোকের মধ্যেই আরও একা হয়ে পড়েন দীপা। অবশেষে চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে হাসপাতাল থেকে সরাসরি বাবার বাড়িতে ফিরে আসেন তিনি। তারপর আর শ্বশুরবাড়িতে যাননি। কারণ, সেখানে ফিরে গেলে আবারও অত্যাচারের মুখে পড়তে হবে বলেই আশঙ্কা তার।

বর্তমানে নিজের কন্যা সন্তানকে নিয়েই দিন কাটছে দীপার। ছোট্ট শিশুটি মাঝেমধ্যে বাবার খোঁজ করে। মায়ের কোল থেকে বাবা বলে ডাকে। সেই মুহূর্তে চোখের জল সামলাতে পারেন না দীপা। কারণ, শিশুটি এখনও বুঝতে শেখেনি তার মা কী যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে দিন কাটিয়েছেন।

দীপা আরও অভিযোগ করেছেন, তার স্বামী একাধিক সম্পর্কে জড়িত। বিভিন্ন মহিলার সঙ্গে আপত্তিকর সম্পর্ক ছিল বলেও দাবি তার। এসব নিয়ে প্রশ্ন তুললেই জুটত মারধর ও গালিগালাজ। শিলিগুড়ির আসিঘর এলাকার ঢাকেশ্বরী রণজিৎ মোড়ে ছিল তার শ্বশুরবাড়ি। বাইরে থেকে দেখলে সুখের সংসার বলেই মনে হতো। কিন্তু সেই সংসারের ভিতরেই প্রতিদিন একটু একটু করে ভেঙে যাচ্ছিল এক তরুণীর জীবন।

এখন আইনের দ্বারস্থ হয়েছেন দীপা। নিজের ও কন্যা সন্তানের ভরণপোষণের দাবি জানিয়েছেন তিনি। তার দাবি, শ্বশুরবাড়িতে এখনও তার বহু জিনিসপত্র পড়ে রয়েছে। কিন্তু সেই বাড়িতে ফিরে যাওয়ার সাহস আর নেই। তবে এত কষ্টের মধ্যেও হার মানতে রাজি নন দীপা। মুখে ছোট্ট এক চিলতে হাসি রেখে তিনি বলেন, আমার মেয়েকে মানুষ করাই এখন আমার একমাত্র স্বপ্ন। ওকে ভালোভাবে বড় করব। ও যেন কোনওদিন এই কষ্ট না পায়।

একসময় যে মেয়েটি রঙিন স্বপ্ন নিয়ে নতুন জীবন শুরু করেছিল, আজ সেই মেয়েই জীবনের কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে লড়ছেন প্রতিদিন। চোখে জল থাকলেও বুকের ভেতর এখনও বেঁচে আছে এক মায়ের অদম্য সাহস।

আমাদের এই প্রতিবেদন শুধু একজন দীপাকে নিয়ে নয়। এমন হাজারো দীপা আজ আমাদের চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। কেউ বিচার পেলেও, অনেকে এখনও আদালতের দরজায় দরজায় ঘুরছেন। কেউ স্বামীর সংসার ছেড়ে বাপের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন, আবার কেউ হাজারো যন্ত্রণা সহ্য করেও সংসার টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন। নারী সুরক্ষা ও নারীদের অধিকার নিয়ে যত আলোচনা, প্রচার ও আইনই থাকুক না কেন, সমাজের এক বড় অংশের নারীরা এখনও নীরবে অত্যাচারের শিকার হয়ে চলেছেন।






