বাবলু রহমান, জলপাইগুড়ি: উত্তরবঙ্গের গ্রামীণ জীবনে একসময় চৈত্র মাসের শেষ দিনটি ছিল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। রাজবংশী ক্ষত্রিয় সমাজের হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষের মধ্যে এই দিনটি ঘিরে পালিত হতো এক অনন্য লোকাচার—“ভাজাভূজা” বা চৈত্রের শেষ দিনের অনুষ্ঠান। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ঐতিহ্য আজ অনেকটাই হারিয়ে যেতে বসেছে।ভোর হতেই গ্রামের মানুষজন বেরিয়ে পড়তেন বিভিন্ন ধরনের পাতা ও উপকরণ সংগ্রহ করতে—যেমন পানি মুথারি পাতা, বিস্তি ফল ও পাতা, ভান পাতা ইত্যাদি। এরপর শুরু হতো মূল অনুষ্ঠান। প্রথমে বাড়ির ঠাকুরের পূজা দেওয়া হতো। পূজার উপকরণ হিসেবে থাকত চিনি, চম্পা কলা, দুধ, দই এবং চালের মাখা।পূজা শেষ হলে বাড়ির প্রতিটি দরজায় ঝুলিয়ে দেওয়া হতো সংগ্রহ করা পাতা, সঙ্গে রসুন, স্থানীয় পেঁয়াজ, আদা ও হলুদ। বিশ্বাস ছিল, এগুলো অশুভ শক্তিকে দূরে রাখে এবং পরিবারকে সুস্থ রাখে।এই দিনটিতে বাড়িতে সাধারণ রান্না করা হতো না। পরিবর্তে চিঁড়ে, ছোলা ভাজা, ঘুগনি এবং বিভিন্ন কাঁচা খাবার খাওয়া হতো। কাঁচা উপকরণের মধ্যে থাকত আম, কাঁঠাল, বিস্তির ফল, রসুন, পেঁয়াজ, শুকনো পাটপাতা, আদা ও হলুদ।দিনের শেষে রাতে সাত রকম শাকসবজি দিয়ে একটি বিশেষ তরকারি রান্না করা হতো। এই একমাত্র পদ দিয়েই সারা পরিবারের ভুরিভোজ সম্পন্ন হতো। এই আচারকে ঘিরে একটি প্রবাদও প্রচলিত ছিল—“যেমন দেওয়ের তেমন পূজা, মাসান দাওয়ের-এর ভাজাভূজা।”তবে আধুনিকতার ছোঁয়ায় এই সুন্দর কৃষ্টি আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। ময়নাগুড়ির ষাটোর্ধ্ব বাসিন্দা বিশ্বনাথ অধিকারী বলেন, প্রযুক্তির যুগে এই ধরনের ঐতিহ্য ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হচ্ছে। ধূপগুড়ির কালীঘাটের উজ্জ্বল রায়ও জানান, একসময় এই অনুষ্ঠান খুব জনপ্রিয় ছিল, কিন্তু এখন তা আর আগের মতো দেখা যায় না।গ্রামাঞ্চলে এখনও কিছুটা অস্তিত্ব থাকলেও শহরে এই অনুষ্ঠানের প্রভাব প্রায় নেই বললেই চলে। নতুন প্রজন্মের অনেকেই এই ঐতিহ্যের কথা জানেই না। তাই এই প্রাচীন লোকসংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে সচেতনতা এবং উদ্যোগ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।
সাম্প্রতিক খবর



