বাবলু রহমানঃ আলিপুরদুয়ার জেলার কালচিন(Kalchini) বিধানসভা ডুয়ার্সের চা বাগান, জঙ্গল আর পাহাড়ঘেরা এই এলাকা এখন ভোটের উত্তাপে টগবগ করছে। কিন্তু এই উত্তাপের মাঝেও এমন এক ছবি সামনে এল, যা একেবারে আলাদা যেখানে রাজনীতির সঙ্গে মিশে গেল সংস্কৃতি, আর প্রচারের সঙ্গে জুড়ে গেল মানুষের টান।
তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী বীরেন্দ্র বারা ওরাও (Birandra Bara Orao) মনোনয়ন জমা দেওয়ার পর থেকেই এক মুহূর্ত বসে নেই। ভুটান(Bhutan) পাহাড়ের পাদদেশে থাকা চা বলয় জুড়ে চলছে টানা প্রচার। তবে শুধু সভা মিছিল নয়, তাঁর প্রচারের ধরনটাই একটু অন্যরকম মানুষের মধ্যে ঢুকে পড়া, তাদের সঙ্গে সময় কাটানো, তাদের ভাষায় কথা বলা।
এরই মাঝে তিনি পৌঁছে যান ডুয়ার্সের পোরো বস্তি (Poro Basti) এলাকায় যেখানে একসঙ্গে বসবাস করে প্রায় ৪০টি জনজাতি ও সম্প্রদায়ের মানুষ। তাই জায়গাটার নামই হয়ে গেছে “মিনি ইন্ডিয়া”(MINI India)। সেদিন সেখানে খোলা আকাশের নিচে জমেছিল এক জমজমাট সাংস্কৃতিক আয়োজন। মেচ (Mech), রাভা (Rabha), বড়ো (Boro), গারো (Garo), অসুর (Ahsur), ওরাও (Orao), সাঁওতাল (Saotal) নানান সম্প্রদায়ের মানুষ নিজেদের ঐতিহ্য তুলে ধরতে একত্রিত হয়েছিলেন।

ঠিক তখনই সেই অনুষ্ঠানে হাজির হন তৃণমূল প্রার্থী (TMC)। কোনো রাজনৈতিক ভাষণ নয়, কোনো স্লোগান নয় বরং একেবারে আপনজনের মতো সবার সঙ্গে মিশে গেলেন তিনি। গল্প করলেন, সময় কাটালেন, আর কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখা গেল ঢোলের তালে নাচেও সামিল হয়েছেন। সেই মুহূর্ত যেন প্রচারের বাইরেও এক অন্য বার্তা দেয় মানুষের সঙ্গে সম্পর্কই আসল শক্তি।
রবীন্দ্র নিজেও বলেন খুব সহজ ভাষায় এই কালচিনি, এই তরাই ডুয়ার্সটাই (Tarai Dooars) আসলে মিনি ইন্ডিয়া। এখানে সব জাতি, সব ধর্ম, সব ভাষার মানুষ একসঙ্গে থাকে। আমি শুধু প্রার্থী না, আমি এই সবারই একজন।

অন্যদিকে স্থানীয় মানুষের প্রতিক্রিয়াও ছিল বেশ ইতিবাচক। বাসিন্দা বিনয় নার্জিনারি (Binay Narjinari) জানান, “আমরা প্রায় ১৪টা জনজাতি মিলে একটা প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছি। প্রতি বছর কলকাতায় গিয়ে আমাদের সংস্কৃতি তুলে ধরি। গতবার যাওয়া হয়নি, তাই এই গেট টুগেদার। উনি নিজে থেকে জানতে চেয়েছিলেন আসতে পারবেন কিনা। এত ব্যস্ততার মাঝেও উনি এসেছেন এটা আমাদের খুব ভালো লেগেছে। আমরা চাই উনি জিতুন, কারণ উনাকে আমরা পাশে পেয়েছি।”
তবে এই আবেগঘন ছবির পাশাপাশি বাস্তব সমস্যাও রয়েছে যথেষ্ট। চা বাগান (TEE Garden) নির্ভর এই এলাকায় শ্রমিকদের সমস্যা একটা বড় ইস্যু। মোট ২১টি চা বাগানের মধ্যে একটি পুরোপুরি বন্ধ, আর কয়েকটি অচল অবস্থায়। বকেয়া মজুরি, পিএফ, সুযোগ-সুবিধা এসব নিয়েই মানুষের ক্ষোভ আছে।

এই প্রসঙ্গে রবীন্দ্র বলেন, আগের থেকে অনেক কিছু বদলেছে। শ্রমিকদের মজুরি ৬৬ টাকা থেকে বেড়ে ২৫০ হয়েছে, খুব শিগগিরই ৩০০ হবে। এখন সরকার নজর রাখছে কোনো বাগান তিন মাস বন্ধ থাকলে নতুন মালিক আনার সুযোগ রয়েছে।
চা শ্রমিকদের লবণ দিয়ে চা খাওয়ার অভিযোগ নিয়েও প্রশ্ন উঠলে তিনি বলেন, “কে এসব বলছে জানি না। এখন চা বাগানে হাসপাতাল, অ্যাম্বুলেন্স, ক্রেশ, রাস্তা অনেক উন্নয়ন হয়েছে। আগে এসব কিছুই ছিল না।”
ভোটে জিতলে কী করবেন, সেই প্রশ্নে তিনি স্পষ্ট রোডম্যাপও তুলে ধরেন প্রথমেই নদীভাঙন ঠেকাতে বাঁধ তৈরি করা, কারণ অনেক জায়গায় নদী বাড়ির কাছে চলে এসেছে। তারপর পানীয় জলের সমস্যা মেটানো অনেক এলাকায় জলস্তর নেমে গেছে।
জঙ্গলে ঘেরা এলাকায় সোলার লাইট বসানো, যাতে বন্যপ্রাণীর ভয় কমে। আর সবচেয়ে বড় স্বপ্ন একটা স্পোর্টস একাডেমি তৈরি করা।

তিনি বলেন, আমাদের এখানে ফুটবলের প্রতি ভীষণ টান। সঠিক ট্রেনিং পেলে এখানকার ছেলেমেয়েরা জাতীয় আন্তর্জাতিক স্তরে খেলতে পারবে। এর পাশাপাশি ডুয়ার্সের পর্যটনকেও উন্নত করতে চান তিনি। রাজাভাতখাওয়া (RajaBhatkhawa), দলসিংপাড়া (Dalsing Para) এমন অনেক জায়গা আছে যেখানে ট্যুরিজম গড়ে উঠলে কর্মসংস্থানের নতুন রাস্তা খুলে যাবে।
রাজনৈতিক আক্রমণও অবশ্য বাদ যায়নি। বিজেপির (BJP) বর্তমান বিধায়ককে নিশানা করে তিনি বলেন, মানুষ ২৮ হাজার ভোটে জিতিয়েছিল, কিন্তু পাঁচ বছরে কোনো উন্নয়ন হয়নি। এবার মানুষই জবাব দেবে।
সব মিলিয়ে কালচিনি এখন জমজমাট লড়াইয়ের মুখে। একদিকে উন্নয়নের দাবি, অন্যদিকে মানুষের প্রত্যাশা আর তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে এক প্রার্থী মানুষের সঙ্গে মিশে নিজের জায়গা পোক্ত করার চেষ্টা করছেন।
শেষ পর্যন্ত কে জিতবে, তা বলবে ভোটের ফল। তবে এই মুহূর্তে একটা কথা স্পষ্ট কালচিনির মাটিতে রাজনীতি শুধু মঞ্চে নয়, মানুষের মাঝেই তৈরি হচ্ছে।






