স্থানীয় বাসিন্দা, পরিবেশ প্রেমী, বনকর্মী ও দমকল বাহিনীর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আয়ত্তে এল টিয়াবন জঙ্গলের দাবানল

সাহেনা পারভিন, ডুয়ার্স ঃ জলপাইগুড়ি জেলার খড়িয়াবন্দর টিয়াবন জঙ্গলে গত তিন দিন ধরে চলা ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড অবশেষে নিয়ন্ত্রণে এসেছে। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই দাবানল ঘিরে এলাকাজুড়ে উদ্বেগের সৃষ্টি হলেও স্থানীয় বাসিন্দা, পরিবেশ কর্মী, বন দপ্তর এবং দমকল বাহিনীর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত আয়ত্তে আনা সম্ভব হয়েছে।

জানা গেছে, খরা মরসুমের মধ্যেই মহাকাল মন্দির সংলগ্ন টিয়াবন জঙ্গলে হঠাৎ করে আগুন লাগে। প্রথমে স্থানীয় বাসিন্দারা জঙ্গলে আগুন দেখতে পেয়ে খবর ছড়িয়ে দেন এবং আগুন নেভানোর কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন। খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছান চালসা নেচার অ্যান্ড অ্যাডভেঞ্চার সোসাইটির সম্পাদক সুমন চৌধুরী এবং তাঁর সংগঠনের সদস্যরা। স্থানীয় যুবকদের সঙ্গে নিয়ে গাছের ডালপালা ব্যবহার করে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা শুরু করা হয়।
সুমন চৌধুরী জানান, খরা মরসুম এলেই প্রায় প্রতি বছরই এই জঙ্গলে আগুন লাগার ঘটনা ঘটে এবং অনেক সময় তা ভয়াবহ আকার ধারণ করে। এবারের ঘটনাতেও আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং শুকনো পাতা ও গাছের ডালপালার কারণে দাবানল আরও তীব্র হয়ে ওঠে। মঙ্গলবাড়ি বস্তি ও আশপাশের এলাকার যুবকরাও আগুন নেভানোর কাজে এগিয়ে আসেন। প্রায় আধা ঘণ্টা ধরে স্থানীয়দের সঙ্গে তিনি আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চালান।

পরে খবর পেয়ে দমকল বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। মালবাজার ফায়ার স্টেশনের কর্মীরা এসে শাল গাছসহ বিভিন্ন শুকনো ও কাঁচা গাছে লেগে থাকা আগুন নেভানোর কাজ শুরু করেন। দীর্ঘ প্রায় ছয় ঘণ্টার প্রচেষ্টার পর আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসে বলে জানা গেছে।
মালবাজার ফায়ার স্টেশনের ফায়ার ইমার্জেন্সি অফিসার (FEO) দীপক বর্মণ জানান, আগুন লাগার সঠিক কারণ নিশ্চিতভাবে বলা না গেলেও অনুমান করা হচ্ছে কেউ হয়তো শুকনো জঙ্গলে বিড়ি বা সিগারেট ফেলে দেওয়ার ফলে আগুনের সূত্রপাত ঘটতে পারে। জঙ্গলের পাশেই প্রধান সড়ক ও বসতবাড়ি থাকায় আগুন ছড়িয়ে পড়লে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারত বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
অন্যদিকে পরিবেশ কর্মীদের অভিযোগ, জঙ্গলের পাশে একটি ডাম্পিং গ্রাউন্ড থাকায় সেখানে নিয়মিত আবর্জনা ফেলা হয়। এই বিষয়টি নিয়ে আগেও বহুবার প্রতিবাদ জানানো হলেও স্থায়ী কোনো সমাধান হয়নি। তাঁদের মতে, এই ধরনের পরিবেশগত সমস্যাও জঙ্গলে আগুন লাগার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

পরিবেশ কর্মীরা আরও জানান, প্রায় ২০ থেকে ৩০ বছর আগে খড়িয়াবন্দর টিয়াবন জঙ্গল পাখির কলতানে মুখরিত থাকত। কিন্তু বর্তমানে সেই পরিবেশ অনেকটাই হারিয়ে গেছে। তাই বন দপ্তরের কাছে জঙ্গল পরিষ্কার রাখা ও নতুন করে বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ নেওয়ার আবেদনও জানানো হয়েছে।
এদিকে তিন দিনের অগ্নিকাণ্ড অবশেষে নিয়ন্ত্রণে আসায় স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। সকলের উদ্দেশ্যে আবেদন জানানো হয়েছে—জঙ্গলে কেউ যেন অসাবধানতাবশত আগুন না লাগান এবং জঙ্গলের ভেতরে কোনো দাহ্য পদার্থ বা আবর্জনা ফেলে না যান। সচেতনতা ও সম্মিলিত উদ্যোগেই ভবিষ্যতে এই ধরনের বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব বলে মনে করছেন পরিবেশ কর্মীরা।


